
পিলখানায় এক শহীদের স্ত্রী
আশায় বেঁচে আছি বিচার হবে মানুষ জানবে নেপথ্যে কারা
- আপলোড সময় : ২৬-০২-২০২৫ ০৪:৫৭:০৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৬-০২-২০২৫ ০৪:৫৭:০৯ অপরাহ্ন


২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার পিলখানায় সেনা সদস্যদের হত্যার ঘটনা ঘটে। সেখানে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মারা যান ৭৪ জন। হত্যার এই ঘটনাকে ‘জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি’ ও ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালনের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল শহীদ সেনা পরিবারের। সেটি বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার কর্ণপাত করেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করে।
ফলে এর মধ্য দিয়ে শহীদ সেনা পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি আর আক্ষেপ ঘুচল। একই সঙ্গে তাদের মনে নতুন করে আশা জাগল হত্যার ঘটনায় জড়িতদের সঠিক বিচার পাওয়ার। সেই আশা নিয়েই এবার এক ‘ভিন্ন আবহে’ শহীদ পরিবারগুলো স্মরণ করছেন শহীদ সেনা সদস্যদের। প্রথমবারের মতো এবার পালন হওয়া এই দিবসের শুরুতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার বনানীর সামরিক কবরস্থানে নিহত সেনাসদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী রিতা রহমান জুলি বলেন, আমরা খুব বেশি কিছু চাইনি। চেয়েছি শহীদি মর্যাদা এবং বিচারটা সুষ্ঠুভাবে হোক। যারা দোষী তারা যেন সামনে আসে, যেন সুষ্ঠু বিচারটা হয়। তিনি বলেন, শহীদ সেনা দিবসের দাবি পূরণ হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য যেহেতু কমিশন গঠন হয়েছে। আমরা আসলে আশার ওপরেই বেঁচে আছি, আশায় বেঁচে থাকতে হবে। আশ্বস্ত হচ্ছি বিচার হবে, মানুষ জানবে ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল।
শহীদ মেজর হুমায়ুন হায়দারের (পিএসসি) স্ত্রী শামীমা পারভিন বলেন, আমাদের একটি দাবি পূরণ হয়েছে। এখন অপেক্ষা বিচারের। আমরা একটি সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক। তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে আসলে কারা দোষী।
শহীদ কর্নেল কুদরত এলাহীর ছেলে অ্যাডভোকেট সাকিব রহমান বলেন, এতদিন ধরে আমাদের বাবারা আর্মির লিস্টে শহীদ ছিলেন। এই প্রথম বাংলাদেশের এনলিস্টে শহীদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এজন্য এই সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। তিনি বলেন, আমাদের (শহীদ পরিবার) প্রধানত দু’টি দাবি ছিল, একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন, শহীদ সেনা দিবস হিসেবে ঘোষণা। এখন পর্যন্ত আমাদের যে আসল দাবি স্বাধীন তদন্ত সেটি কিন্তু এখন শেষ হয়নি। যদিও একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আমরা অভিযোগ করেছি। এর মূল কারণটা হচ্ছে যদিও তদন্ত কমিশন গঠন না করা হয় কিন্তু তদন্ত যেন চলমান থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা যেন তার (হাসিনা) বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারি। আমি আশা করব যে, এই তদন্ত কমিশন যেটা কি না তদন্ত হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে। প্রকৃত অর্থে যারা দোষী আমরা তাদেরকে যেন এখানে আনতে পারি।
বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা ও এতোদিন পর্যন্ত কেন শহীদ সেনাদের ঘোষণা করা হয়নি, জানতে চাইলে এ শহীদ সেনা কর্মকর্তার ছেলে বলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছিল। কারণ হচ্ছে তারা তো হত্যার ঘটনায় জড়িত। ইতোমধ্যে তিনটা তদন্ত কমিশন হয়েছে। সেই তিনটা কমিশনের তদন্ত অত্যন্ত কম্প্রমাইজড ছিল। সৈনিক যারা ছিল তাদের ঠিকই অভিযুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু পেছনে ষড়যন্ত্রকারীদের আনাই হয়নি। তিনি বলেন, দু’টি লেয়ারে অভিযুক্ত বা ষড়যন্ত্রকারী ছিল। একটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা, আরেকটি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ। যে কারণে তাদের কোনোরকম দোষারোপ করে কোনোরকম তদন্ত করেনি কমিশন।
সাকিব রহমান বলেন, আর্মির পক্ষ থেকে যে তদন্ত কমিশন করা হয়েছিল তার হেড ছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেই তদন্ত কমিশনও ছিল অনেকটা কম্প্রোমাইজড। আমি মনে করি বর্তমান তদন্ত কমিশন আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট দেবেন।
পার্শ্ববর্তী দেশ জড়িত থাকতে পারে, রাজনৈতিকভাবে যাদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠছে সে-সম্পর্কে তিনি বলেন, আপনারাই তো রিপোর্ট করেছেন। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। তাদের (আ.লীগ) একেকজনের বাসায় মিটিং হতো। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার ব্যাপারটা ও আর্মি যে ঢুকতে দিলো না এটাতো শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না। কারণ ডিফেন্স মিনিস্টারও ছিলেন শেখ হাসিনা নিজেই। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির জায়গা থেকে তিনি এটার জন্য দায়ী। তবে পার্শ্ববর্তী দেশের সংশোধিতার বিষয়ে আমি বিশেষ কোনো মন্তব্য করতে চাই না কারণ সেটা করলে সেটা থিওরিটিক্যাল হবে। তবে এটা তো নিঃসন্দেহে সত্য। আমি আশাবাদী তদন্ত কমিশন সেটির তদন্তে বের করে নিয়ে আসবে।
পিলখানায় হত্যাযজ্ঞে বাধাদানকারী শহীদ বিডিআরের কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নূরুল ইসলামের ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, শহীদ সেনা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে পিলখানায় শহীদ আমাদের বাবাদের আত্মত্যাগের প্রতি জাতীয়ভাবে সম্মান দেয়া হয়েছে বলে মনে করি। এই দিবস কি ঘোষণার মাধ্যমে আমরা যে শহীদের সন্তান, আমাদের হৃদয়ের যে ক্ষত সেটি একটু হলেও কমেছে। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে যেন সবাইকে ছেড়ে দেয়া না হয়। এতোদিন আসিনি ভালো লাগতো না, ক্ষোভ ছিল মনে, কেন আসব! এখন সবকিছু পরিবর্তন হয়েছে এজন্য এসেছি। আমরা সবাই যা চাই, ইনশাল্লাহ সে বিচার হবে। সবাই জানি পিলখানা হত্যাকাণ্ড কে বা কারা করেছে, বিচারটা হোক, দেশবাসী দেখুক। এমনভাবে বিচারটা হোক যেন আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে পারি। তিনি বলেন, এত বড় সাহস এতগুলো অফিসারকে মারল, তাদের তো বাবা-মা সন্তান ছিল একটুও কষ্ট লাগেনি? আমরা কষ্ট পাচ্ছি।
পিলখানায় শহীদ কর্নেল এমদাদুল ইসলামের মেয়ে বলেন, এতো বছর আমরা একটা জালিম শাসনের অধীনে ছিলাম। উনি (হাসিনা) ঘটনাটা নিয়ে এতো বছর ধরে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা-ই করেছেন। জালিম শাসক কী না করেছে? যারা হত্যা করেছে, বিচারের আওতায় নিয়ে আসছে, অনেকে জামিন পাচ্ছে। আমরা তো পিলখানায় ছিলাম, অনেক সৈনিককে হত্যা করা হয়েছে। কেউ জেলে আছেন। আমাদের বাবাকে কারা মেরেছে তা আল্লাহ ছাড়া বলা সম্ভব না। কিন্তু এটা তো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই বিচার। কারণ ইনোসেন্ট সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে। আমাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। মুসলিম হিসেবে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে কেউ কখনো চিরদিন বাঁচে না। কিন্তু বিচার তো হবে যারা ইনোসেন্টদের হত্যা করেছে তাদের।
আরেক শহীদ পরিবারের নারী সদস্য বলেন, আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই। জনগণ যেন জানতে পারে ওইদিন আসলে কী হয়েছিল। দেখি কী হয় আমরা এখন আশা করতে পারি, এই বিচার এই দেশের মাটিতেই হবে। অনেক শুকরিয়া যে, শহীদের মর্যাদা দিয়ে আজকের দিনটি (২৫ ফেব্রুয়ারি) শহীদ সেনা দিবস ঘোষণা ও পালিত হচ্ছে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিজিবি ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ